এম এ হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি :
জলবায়ু পরিবর্তন, খরা-বন্যা আর বাজারের সিন্ডিকেট সব মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের কৃষক। শস্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা থেকে শুরু করে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখা, সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বার বার অসাধু ব্যবসায়ীদের কবলে পড়তে হচ্ছে তাদের। সার, সরকারি ভর্তুকি, প্রণোদনা ও প্রদর্শনী সবকিছুতেই হয়রানির শিকার প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা। গাজীপুরে বোরো ধান রোপণের ভরা মৌসুমের শুরুতেই সার সংকটে দিশেহারা কৃষকরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও অতিরিক্ত মূল্য দিয়েও সার পাচ্ছেন না তারা। তবে স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, সমস্যা সমাধানে চেষ্টা চলছে।
বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ তুলেছেন এ জেলার কৃষকরা। চাহিদা বাড়ায় অবৈধভাবে সার মজুত করছে অসাধু চক্র। কৃষকদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট স্থানে ডিলাররা সার বিক্রি না করে চড়া দামে অন্যত্র বিক্রি করছেন। সংকটের অজুহাতে বস্তাপ্রতি দাম বাড়ানো হয়েছে ৪শ থেকে ৫শ টাকা। কৃষকরা বলছে, বিদ্যুৎ এবং সারের সংকট সমাধান ও দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আগামী দিনে বোরো ধান উৎপাদনে বেশ বেগ পেতে হবে তাদের। তাছাড়া সারের দাম বৃদ্ধিতে বেড়েছে উৎপাদন খরচও। সার সংকট সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ কৃষকদের। তারা আরো বলছেন, বিক্রেতারা সার বিক্রির পর রশিদ দিতে অস্বীকার করেছেন। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের বাড়তি খরচের কারণে তাদের মতো কৃষকরা ধান চাষে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে, তারা তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিনে জেলার সদর উপজেলাসহ কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর উপজেলায় দেখা যায়, কৃষকরা সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও মিউরেট অব পটাশসহ প্রতি কেজি রাসায়নিক সার সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় চাষিদের কাছ থেকে চার-পাঁচ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। প্রতি কেজি ইউরিয়া ৩২ টাকা ও প্রতি কেজি টিএসপি ৩৫ টাকায় কিনছেন তারা। সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় যা অনেক বেশি। উভয় পণ্যের দাম প্রতি কেজি ২৭ টাকা। এছাড়া, প্রতি কেজি ডিএপি ২১ টাকা ও এমওপি ২০ টাকায় পাওয়ার কথা। অথচ কৃষকরা সেখানেও দিচ্ছেন বাড়তি মূল্য। চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকদের জন্য এটি বড় ধাক্কা। এই মৌসুমেই দেশে সবচেয়ে বেশি ধান চাষ হয়। জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ওয়ার্ড পর্যায়ে খুচরা সার বিক্রেতারা অবাধে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে সার বিক্রি করে যাচ্ছেন।
এদিকে জেলার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সারের সংকট প্রান্তিক পর্যায়ে। ওয়ার্ড পর্যায়ে কৃষকরা সার কিনছেন চড়া দামে। কৃষকদের এসব সমস্যা মাঠ পর্যায়ে দেখার কথা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের হয়তোবা তারা এসব দেখছেন না। যার ফলে কৃষকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিও নিরব ভূমিকা পালন করছেন। সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির দায়িত্ব কি? এটাতো তাদের জানা উচিত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুনে খাবারসহ শ্রমিক খরচ ছিল ৫৪৪ টাকা। আগের বছরের জুলাইয়ে তা ছিল ৫১১ টাকা। ২০২৩ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের দাম কেজিপ্রতি ছয় টাকা বাড়ানোর এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্রতি কেজিতে আরও পাঁচ টাকা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে মোট ৫৯ লাখ টন ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি প্রয়োজন হবে বলে সরকারের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। এক বছর আগের তুলনায় তা তিন শতাংশ বেশি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে জানান, বোরো ধান চাষে যে পরিমাণ সার প্রয়োজন হয় এর প্রায় ৬০ শতাংশ প্রয়োগ করা হয় ডিসেম্বর থেকে মার্চে। কিন্তু অনেকে চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা এসব করছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলাম খান বলেন, কেউ কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে অরাজকতা তৈরি করলে আমরা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব। কৃষি কাজে বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সার নিয়ে যেন কোনো ঝামেলা না হয় এজন্য আমরা সজাগ আছি, কোনো অভিযোগ পেলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।
