দ্বৈত নাগরিকত্ব ও এনজিওর অর্থে শম্পার বিলাস জীবন
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরায় প্রেরন নামে এক এনজিও নির্বাহী পরিচালকের বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের আড়ালে দুই দেশে সম্পদ গড়ে তোলা, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত ও ভারতে পাচার, প্রভাব খাটিয়ে এনজিও ব্যুরোর নিবন্ধন নেওয়া এবং বিলাসবহুল জীবনযাপনের বিস্তর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগগুলো ঘিরে স্থানীয়ভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন শম্পা চ্যাটার্জী ওরফে গোস্বামী।তিনি সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নে বাসিন্দা । তিনি প্রেরণা নারী উন্নয়ন সংস্থা”র নির্বাহী পরিচালক। তিনি একই সঙ্গে কালীগঞ্জ উপজেলার মোজাহার মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এমপিওভুক্ত সিনিয়র সহকারী শিক্ষক হিসেবেও কর্মরত রয়েছেন।অনুসন্ধানে জানা গেছে , দুই দেশে সমান্তরাল উপস্থিতি এই শম্পা গোস্বামী ওরফে চ্যাটার্জীর।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয় বহাল রেখেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙ্গা এলাকায় ঠিকানা দেখিয়ে আধার কার্ড, প্যান কার্ড ও ভোটার আইডি গ্রহণ করেছেন। শম্পার বসিরহাট শহরের মির্জাপুর মৌজায় তার নামে জমি ক্রয়,একই এলাকায় মা অনিতা গোস্বামীর নামে বাড়ি নির্মাণ, বসিরহাট কলেজ শাখা পোস্ট অফিসে একাধিক অ্যাকাউন্টে দীর্ঘমেয়াদি আমানত,পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকে যৌথ ব্যাংক হিসাব পরিচালনার। একটি সূত্রের ভাষ্য, “ভারতে প্যান, আধার, ব্যাংক ও পোস্ট অফিস মিলিয়ে একটি শক্তিশালী আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,কেউ সার্কভূক্ত দেশ বিশেষ করে ভারতের নাগরিকত্ব নিলে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব বাতিল হবে, দ্বৈত নাগরিকত্বধারী ব্যক্তি সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে থাকতে পারেন না।
এমনকি বিদেশি নাগরিকের এনজিও পরিচালনায় বিধিনিষেধ রয়েছে।প্রভাব খাটিয়ে এনজিও নিবন্ধনের অভিযোগ:অভিযোগ অনুযায়ী, তার দাদা কল্যাণ ব্যানার্জী একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক। তার প্রভাব ব্যবহার করে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধনের জন্য সাতক্ষীরা জেলা থেকে প্রতিবদেন নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,“এনএসআই, ডিএসবি ও জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হয়নি, প্রভাব খাটিয়ে প্রতিবেদন দ্রুত শম্পা গোস্বামীর পক্ষে নেওয়া হয়েছে।এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে সাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতির সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে এনজিও ব্যুরোর নিবন্ধন নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, সাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতির সাথে পার্টনারে প্রকল্পের কাজ করে-এমন প্রচার দিয়ে শম্পা গোস্বামী কালীগঞ্জে জমি দখল, কারণে অকারণে মামালা দিয়ে অনেককে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করেছেন আওয়ামী লীগ আমল জুড়ে। প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ:-সাতক্ষীরা সদর, কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর এবং খুলনার কয়রা ও বটিয়াঘাট এলাকায় তার প্রেরণা নামের নারী উন্নয়ন সংগঠনের নামে একাধিক প্রকল্প চলমান।
পরিচালিত প্রকল্পগুলোর বড় অংশ কাজ কাগজে ও কলমে দেখানো হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য,“৪০-৫০ শতাংশ কাজ না করে পুরো টাকা তোলা হয়। কোন কোন প্রকল্পে কাজ আরও কম করা হয়।বিগত আওয়ামীলীগ আমলে ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জগলুর হায়দারের কাছ খেকে দুইটি প্রকল্প দেখিয়ে চার লক্ষ টাকা। সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের তৎকালিন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা, সদস্য জামুর কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা গ্রহণ করে। এসব প্রকল্পের কোন ধরণের কাজ না করে বিল-ভাউচার করে টাকা তুলে আত্মসাত করেছে প্রেরণার নির্বাহী পরিচালক শম্পা গোস্বামী।
একইভাবে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তর থেকে প্রতিবছর অনুদানের টাকা পেলেও শুধু মাত্র কাজ বিল-ভাউচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। জমি কেনা থেকে ভবন নির্মাণ-অস্বাভাবিক ব্যয়ের হিসাব:-২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল ২৬ লাখ টাকায় জমি শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নে ক্রয় করে দলিলে উল্লেখ করা হয়েছে ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা। ওই জমি ভরাটে প্রায় ৬ লাখ টাকা,‘গল্পতরি’ নামে কাঠের ঘর নির্মাণে প্রায় ৫ লাখ টাকা,ফুল বাগান তৈরি, জমি রেজিস্ট্রেশন ও মিউটেশনে প্রায় ১ লাখ টাকা ছাড়াও বর্তমানে জমিতে ভবন নির্মাণে অতিরিক্ত ৫০-৬০ লাখ টাকা মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য প্রকল্পের টাকা আত্মসাত করেই এসব করা হচ্ছে। এই ব্যয়ের সঙ্গে তার ঘোষিত আয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই।”বিলাসবহুল জীবনযাপন ও ব্যয়ের অভিযোগ:শম্পা গোসামীর মদ্যপান ও ধূমপানে দৈনিক ১৫-২০ হাজার টাকাসহ অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচ মিলিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন তিনি প্রতি মাসে। তার একজন ঘনিষ্ঠজন বলেন, “তার বৈধ আয় দিয়ে এই জীবনযাপন সম্ভব নয়-এটা সবাই বুঝে।”অভিযোগের বিষয়ে শম্পা গোস্বামীর কাছে জানতে চাইলে তিনি তার পাসপোর্ট ও ভারতীয় আঁধার কার্ড এ আই দিনে বানানো বলে দাবী করেন। পাশাপাশি এক গনমাধ্যম কর্মীর ওপর পাল্টা অভিযোগ তোলেন । এছাড়া তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুশিয়ারি দেন তিনি।

