সাতক্ষীরা ভূমি জগতের দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি নায়েব শর্মিষ্ঠা
নিজস্ব প্রতিবেদক :
মুখে পড়ে থাকেন সবসময় মাক্স আর সেই মাক্সের আড়ালের রয়েছে ভয়ংকর ঘুষের চেহারা লুকানো। বলছি সাতক্ষীরায় ভূমি জগতের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মাক্স লেডি শর্মিষ্ঠা সরকারের কথা। মিষ্টি হাসি আর মায়াবী কথায় সহজেই মানুষের মন জয় করে কিন্তু এটা তার অভিনব কৌশল।
ঘুষ আর দুর্নীতির মহারাণী শর্মিষ্ঠা সরকার সুন্দর চেহারা দেখিয়ে সবসময় বাগিয়ে নেন ভালো কর্মস্থলগুলোতে পদায়ন । চাকরিজীবনে যেখানে গিয়েছে সেখানে গড়ে তুলেছে ঘুষের সিন্ডিকেট। চাকরি জীবনে ঘুষের অভয়ারণ্যে কালিগঞ্জের মৌতলা, ভাড়াশিমলা, বসন্তপুর, সদরের আগরদাড়িতে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে ফিংড়ী ভূমি অফিসে কর্মরত রয়েছে।
সাতক্ষীরা পৌর ভূমি অফিসে কর্মরত থাকাকালীন নামজারি, খাজনা দাখিলায় রয়েছে তার তৈরি দালাল সিন্ডিকেট। প্রতিটা নামজারি জন্য শর্মিষ্ঠা পায় ১ হাজার টাকা, একটি রির্পোট প্রদানে পায় ১-২ হাজার টাকা। ঝামলো পূর্ণ জমিতে বাগিয়ে নেন লাখ টাকা।শর্মিষ্ঠার হাতের ছোঁয়ায় ঘুষের অভয়ারণ্যে হিসাবে গড়ে উঠেছে তার দায়িত্বরত বর্তমান ও পূর্বের কর্মস্থলগুলো। তিনি সরাসরি টাকা নেন না যেন ধরি মাছ না ছুই পানি। প্রতিটা নামজারির ঘুঘের ১০০০ টাকা কেস নং দিয়ে নিজস্ব ডায়রিতে লিখে রাখে যেন ভাগে কম না পড়ে ।
সম্প্রতি সদর দেওয়ানী আদালতে মামলায় রায়প্রাপ্ত একটি জমির নামজারির জন্য আখড়াখোলার এক মহিলার কাছে ২ লাখ ঘুষ দাবি করেন শর্মিষ্ঠা। শর্মিষ্ঠার এই ঘুষ দাবি কল রেকর্ড গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। পরে এক সাংবাদিকদের মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ঘুষের কোটি টাকা কৌশলে স্বামী বোনের নামে সম্পদ ক্রয় ও ব্যাংকে ডিপোজিট রেখেছে যাহাতে কোন গণমাধ্যম কোন সংবাদ প্রকাশ করে দুর্নীতিবাজ শর্মিষ্ঠার কিছু না করতে পারে। সুকৌশলে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন সবসময় এই শীর্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা।
যোগাযোগ ও রাখেন লাঘব বোয়ালদের সাথে।সহজেই সুন্দর চেহারা দেখিয়ে সর্ম্পক গড়তে পারে।সরজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৫ সালে সদর উপজেলা ধুলিহর ভূমি অফিসে শর্মিষ্ঠা সরকার যোগদান করেন উপ সহকারী ভূমি কর্মকর্তা হিসাবে। যোগদানের পর ভূমি অফিসের ফাঁক ফোঁকর ভাল করে আয়ত্ত করে নেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতা বাবা প্রশান্ত কুমারের তদবির করে মৌতলা ভূমি অফিসে যোগদান করেন। মৌতলায় যোগদানের পরে শর্মিষ্ঠার ঘুষ বাণিজ্যর নতুন কর্মযঞ্জ শুরু । তৎকালীন মৌতলার ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোশাররফ সাথে যোগসাজশে সাথে সুসম্পর্ক রেখে খাস জমি ইজারা,মৌতলা বাজারে দোকান বরাদ্দ, ভূয়া দলিলে নামজারি বিনিময়ে হাতিয়ে নেন লক্ষ লক্ষ টাকা।
তার অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে তৎকালীন সন্ত্রাশী সাঈদ বাহিনী দিয়ে মারপিট করানো হত। সরকারের প্রভাব খাটিয়ে একই কর্মস্থলে ৬ বছর ছিলেন শর্মিষ্ঠা যেটা সাতক্ষীরা ইতিহাসে নজির বিহীন। সেই সময় ঘুষের টাকায় একাধিক জায়গায় জমি ক্রয় করেন পরিবারের নামে।মৌতলায় ঘুষের রাজত্বে থেকে বদলি হয়ে আসেন ভাড়াশিমলা ভূমি অফিসে।
তৎকালীন সেই সময়ে ভাড়াশিমলায় কর্মরত নায়েব ছিল ঘুষখোর ইউনূস চিশতী। তার গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট। যোগদানের পরে ইউনুস চিশতীর সাথে সুম্পর্ক গড়ে তোলে শর্মিষ্ঠা। দুজনে মিলে ভাড়াশিমলা ভূমি অফিসে গড়ে তোলেন ঘুষের রাজ্য। খাসজমি ইজারা,খাজনা দাখিলা, নামজারি সিন্ডিকেটসহ বহু অপরাধচক্রে জড়িয়ে যান । ভাড়াশিমলায় তাদের দুর্নীতি বিরুদ্ধে তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্রে লেখালেখি হয়। নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসন নেয় বদলির সিদ্ধান্ত। কিন্তু ইউনূস চিশতী টাকার বিনিময়ে শর্মিষ্ঠাকে সাথে নিয়ে পাশের ভূমি অফিস বসন্তপুরে বদলি হন একসাথে। ইউনুস চিশতী চাকরিজীবনে যেখানে যেতেন সেখানে শর্মিষ্ঠাকে বদলি করে নিয়ে যেতেন। বসন্তপুর গিয়েও দুজনে মিলে ভূমি অফিসে ঘুষ বাণিজ্য সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
বিভিন্ন অসহায় মানুষকে খাসজমি দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে আর ফেরত দেননি। ইউনূস চিশতী ও শর্মিষ্ঠার সুসম্পকে ভাটাপড়লে শর্মিষ্ঠা বদলি হয়ে শ্যামনগর সদর ভূমি অফিসে যোগদান করেন। সেখানে তৎকালীন দায়িত্বরত নায়েব অসীম কুমারকে সুকৌশলে ফেলে বস করে নেন। তাকে দিয়ে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে টাকা হাতিয়ে নেন সেবাগ্রহীতাদের থেকে। ৩ মাস পর ঘুষের টাকা ভাগাভাগি দ্বন্দ্ব হলে শর্মিষ্ঠা বদলি হন পারুলিয়া ভূমি অফিসে। পারুলিয়া ভূমি অফিসে এসে সুবিধা না করতে পারায় বদলি হন সদর উপজেলার আগরদাড়ি ভূমি অফিসে।
৫ ই আগষ্ট পরবর্তী সরকারের কিছু নেতাকে হাতে রেখে ঘুষের রামরাজত্ব কায়েম করেন আগরদাড়িতে । ২ টি ইউনিয়ন মিলে ১ টি ভূমি অফিস হওয়ায় সুযোগ কাজে লাগাতে দ্বিধাবোধ করেননি শর্মিষ্ঠা সরকার। চড়তেন দামি ব্রান্ডের ভাড়ায় চালিত প্রাইভেটকার। মাসে লাখ টাকা ভাড়াচুক্তিতে কালিগঞ্জ থেকে যাতায়াত করতেন আগরদাড়ি ভূমি অফিসে মাসের পর মাস। বিভিন্ন সেবাগ্রহীতাদের থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগে শাস্তি চেয়ে আবেদন করলেও কোন সুরহা পায়নি। বরং উল্টো কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে বদলি হয়ে আসেন ঘুষের রাজ্য পৌরভূমি অফিসে। শর্মিষ্ঠার এমন কর্মকান্ডে হতাশ অনান্য ভূমি সহকারী কর্মকর্তারা।
অনেকে জানিয়েছেন, সুন্দর চেহারাকে পুঁজি করে শর্মিষ্ঠা সরকার সবসময় অপরাধ করেও পারপেয়ে গেছেন বরং ভালজায়গায় বদলি হয়েছেন।কৌশলে ভাড়াশিমালার নায়েব নন্দকে মহিলা দিয়ে ফাসিয়ে আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে তাকে বরখাস্ত করেন। সদর উপজেলার আগরদাড়ি ও পৌর ভূমি অফিসে থাকাকালীন এক তরুণ সাংবাদিকের সাথে গভীর প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। সেই সাংবাদিককে ব্যবহার করে অনেক অনৈতিক কার্য হাসিল করে নেন। তাদের প্রেম কাহিনী পুরো সাংবাদিক মহলে জানাজানি হলে তীব্র সমালোচনার জন্ম নেয়। পরবর্তীতে সেই সাংবাদিকের কাছে থাকা প্রেম আলাপ কল রেকর্ড ফাঁসের গুঞ্জন উঠলে সাংবাদিককে বিভিন্ন ভাবে ম্যানেজ করেন।
বিষয়টির শর্মিঁষ্ঠার পুরো পরিবার জেনে যায়। জেলা প্রশাসন জনাতে পেরে তড়িঘড়ি করে ফিংড়ী ভূমি অফিসে বদলি করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভূমি কর্মকর্তা বলেন, সাংবাদিককে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শর্মিষ্ঠা বিভিন্ন ঘুষ বাণিজ্যর সমস্যা সমাদান করেছে। তার পরিবার জানতে পেরে তাদের সম্পর্কে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। সে যাকে প্রয়োজন তার সাথে সম্পর্কে করতে পারে তার কৌশলটা ভিন্ন মানুষকে সহজে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে পারে।অনুসন্ধান আরও বলছে, শর্মিষ্ঠার খুবই সুকৌশলে ঘুষ বাণিজ্য করেন। তার ঘুষের টাকা তার স্বামী ও ছোট বোনের একাউন্টে জমা রেখেছে। তাছাড়া তার বোনের নামে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি জায়গায় জমি কিনে দুইতলা বাড়ি নির্মাণ করেছে।
শর্মিষ্ঠার স্বামী মাঝে মাঝে ভারতের সেই বাড়িতে যাতায়াত করে। কালিগঞ্জে ৫০ -৬০ লক্ষ টাকা মূল্যে একটি প্লট আছে শর্মিষ্ঠার নামে। তার স্বামী নামে শ্যামনগরের নূরনগরে কয়েক একর কৃষি জমি ক্রয় করেছে। ঘুষের কোটি কোটি টাকা থাকার স্বত্বেও কালিগঞ্জে একটি বিলাশবহুল ভাড়াবাড়িতে বসবাস করে শর্মিষ্ঠা সরকার। তারা ভাড়া বাড়িতে বসবাসটা কৌশলের একটি হাতিয়ার। তার সন্তানকে উচ্চব্যয়ে ক্যাডেট কলেজে পড়ালেখা করান। স্বামী কিছু না করলেও শর্মিষ্ঠার বিলাশবহুল জীবনযাপনে মাসে ব্যয় ১- ২ লাখ টাকার উপরে।আদালতে রায়ে জমির নামজারির জন্য ২ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া ভুক্তভোগী আখড়াখোলার হিন্দু মহিলা বলেন, আমার আখড়াখোলা বাজারে একটি জমি দীর্ঘদিন আদালতে মামলা চলার পরে রায় পাই। সেই রায়ের ধারাবাহিকতায় নামজারির জন্য সদর ভূমি অফিসে পাঠায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ঘুরাতে থাকে সদর উপজেলা ভূমি অফিস।পরে সার্ভেয়ার তারেক নায়েব শর্মিষ্ঠা সরকারের কাছে পাঠায় সে ২ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করে। আমি বহু কষ্টে কান্নাকাটি করলে ১ লাখ টাকায় রাজি হয়। নায়েব শর্মিষ্ঠার ঘুষ চাওয়ার সকল কথাপোকথন আমার মোবাইলে রেকর্ড করা আছে। আমি তার দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবি করি। সে ঘুষ ছাড়া কোন কাজ করে না।
আরেক ভুক্তভোগী শহরের থানাঘাটা গ্রামের ফারুক হোসেন বলেন, নায়েব শর্মিষ্ঠা চরম ঘুষখোর। আমার একটি জমির ১৪৫ ধারা মামলার প্রতিবেদনের জন্য টাকা দাবি করে। আমি টাকা দিতে অস্বীকার জানালে বিরোধীপক্ষের কাছে টাকা নিয়ে তার পক্ষে প্রতিবেদন দেয়। আমি তার শাস্তি দাবি করি তারঘুষখোর মহিলা জনসম্মুখে বিচার করা হোক।ভুক্তভোগী আগরদাড়ির করিম দালাল জানান, আমার ১৯ শতক জমির ঝামেলা ছিল নামজারি নিয়ে আইনী জটিলতা ছিল। আমার রেকর্ড সংশোধনী মামলায় রায় পাওয়ার পরেও নায়েব শর্মিষ্ঠাকে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল নামজারির জন্য।
আগরদাড়ির শত শত মানুষের থেকে নামজারিতে কয়েক লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই মুখোশধারী নায়েব শর্মিষ্ঠা।ভুক্তভোগী ভাড়াশিমলার হরিদাস ঠাকুর বলেন, আমার বিরোধীপক্ষের থেকে ১ লাখ টাকা নিয়ে নায়েব ইউনুস চিশতী ও শমিষ্ঠা সরকার ৭০ শতাংশ একটি জমির অবৈধ উপায়ে তৎকালানী এসিল্যান্ডকে ম্যানেজ করে নামজারি করে দেয়। শুধু আমি বহু মানুষের থেকে টাকা নিয়েছে এইদুইজন খ তফশিল খাস জমির রেকর্ড করার নামে। দুই প্রেমিক প্রেমিকা মিলে ভাড়াশিমলার সাধারণ মানুষকে সর্বশান্ত করেছে। জেলা প্রশাসকের কাছে একাধিক অভিযোগ করে বদলি হয় একসাথে বসন্তপুর ভূমি অফিসে।
অভিযুক্ত জেলার শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সরকার তার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মইনূল ইসলামকে একাধিকবার ফোন দিলে তিনি রিসিভ করে নি।

